ট্রেন ভ্রমণ নিয়ে বেশ কৌতূহল ছিল আমার। অসংখ্যবার ট্রেনে ভ্রমণের বেশ কিছু পরিকল্পনা করলেও শেষমেশ সবই বাতিল করতে হয়েছে। আবার এক নতুন পরিকল্পনা করা হলো ট্রেন ভ্রমণের। এবারের গন্তব্য ‘যশোর’। অন্যান্য দিনের মতো এবারের পরিকল্পনা আর বাতিল হলো না। কমলাপুর থেকে আমাদের সেদিনের ট্রেন ছেড়ে গেল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায়।

ট্রেনে জানালার পাশের সিটটাতে বসলাম। রাতের যাত্রা, তবুও ভাবলাম অনেক কিছু দেখা হবে, হয়েছেও। ঝকঝক ছন্দে, বাইরের রাতের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে যাত্রাটা মনে রাখার মতোই সুন্দর হয়ে উঠল। কিছু খারাপ অভিজ্ঞতাও ছিল অবশ্য, তবে এক গাদা ভালো অভিজ্ঞতার ভিড়ে সেসব মনে রাখার প্রয়োজন পড়ল না।

যশোর রেল স্টেশন যখন পৌঁছলাম আমরা, তখন ঘড়িতে ভোর ৩টা। ঢাকা থেকে হালকা শীতের সন্ধ্যায় রওনা হয়ে এখানে পৌঁছে চমকে গেলাম। হাড় কাঁপানো শীত। কুয়াশায় ঢেকে আছে স্টেশন, এক হাত দূরের দৃশ্যও দেখা যায় না স্পষ্ট। স্টেশনে তখন একটা মাত্র দোকান খোলা, আমরা গরম চা নিয়ে কিছুটা শীত কমানোর চেষ্টায় কাটিয়ে দিলাম পুরো ২ ঘণ্টা (এছাড়া উপায়ও ছিল না)।

ভোর ৫টায় আমরা স্টেশনের গলি থেকে বের হলাম। তখন এলাকাটিতে কিছুটা লোক সমাগম শুরু হয়েছে। কাছের একটা হোটেলে সবাই নাস্তা সেরে নিলাম। তারপর অটো ঠিক করে সবাই চলে গেলাম শহরের ভেতর। এই ভ্রমণ যাত্রাটিও মূলত কাজের সুবাদে।
যশোর পৌর পার্কে বেলা ১১টায় শুরু হয়ে আমাদের আয়োজন শেষ হলো বিকেল ৫টায়। আমাদের ফেরার ট্রেন রাত সাড়ে ৯টায়। আমার হাতে তখন ঘোরার জন্য রইলো মাত্র ৪ ঘণ্টা। বাকিরা আরো কিছু কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেও আমি স্থানীয় দুইজন সদস্য নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম যশোর শহরটি ঘুরতে।
এর আগে কখনো কোনো চার্চে যাওয়া হয়নি আমার। প্রজ্ঞা প্রথমেই জানাল ওদের চার্চে নিয়ে যাবে, জায়গাটি অনেক সুন্দর। তবে অন্য ধর্মের কারো প্রবেশ নিষেধ। প্রজ্ঞা দারোয়ান ও ওদের ফাদারের সঙ্গে কথা বলে অনুমতি আনলো আমাদের জন্য। আমরা চার্চে ঢুকলাম। এটি একটি ক্যাথলিক চার্চ। চার্চের ভেতরটা সুসজ্জিত এবং অসাধারণ। বিশাল একটি পুকুর আছে, নিয়মিত প্রার্থনার জায়গাসহ ভেতরে আছে উৎসব আয়োজনে প্রার্থনার আলাদা জায়গা, ফাদার এবং সিস্টারদের জন্য একটি ভবন ও একটি হাসপাতাল।
এরপর আমরা পথ ধরলাম পৌরসভার দিকে। যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল দেখেছেন তারা এখানে এলে কিছুটা চমকাবেন। যদিও পুরোপুরি মিল নেই, তবে অনেকটা মিল থাকায় মনে হবে কার্জন হলেই হাঁটছেন। যশোর শহরটি অত্যন্ত সুন্দর একটি শহর। শহরটি অনেক উন্নত এবং এখানকার মানুষজন অনেক সংস্কৃত-মনা। সেটা বুঝতে পারবেন শহরটিতে পা রাখলেই। অসংখ্য স্কুল-কলেজের পাশাপাশি এখানে আছে নাচ, গান, শিল্পচর্চার বেশ কিছু কেন্দ্র।
পায়ে হেঁটে আমরা শহরের অনেকটা জায়গা ঘুরলাম। যশোর টাউন হল, লাইব্রেরি, স্বাধীনতা উন্মুক্ত মঞ্চসহ শহরের অলিগলিতে ছড়িয়ে থাকা জায়গাগুলো ঘুরে ঘুরে দেখলাম। হাঁটার পর্বটা তুলে রেখে দীপ ভাইয়ার মোটরসাইকেলে চড়ে বসলাম। অনেকটা অন্ধকার হয়ে এসেছে তখন। যশোর শহরে কুয়াশায় ভরা প্রথম শীতের সন্ধ্যা আমার। ফেরার ট্রেনে চড়ে বসার আগে আরো অনেকটা দেখে নিতে চেয়েছি যশোরকে। ভাইয়া এখানকার স্থানীয়, সামনে আসা প্রত্যেকটা জায়গার বর্ণনা শোনালেন তিনি।
যশোর শহর, বেশ কিছু স্কুল, কলেজ ও সাংস্কৃতিক চর্চার স্থান দেখে আমরা গ্রামের দিকটায় গেলাম। জমজমাট, চাকচিক্যে ঘেরা শহরের পর এলো অসাধারণ গ্রাম। বিশাল ধানক্ষেতের পাশ ধরে সাঁইসাঁই করে ছুটে চলা মোটরসাইকেলে বসে শুনতে লাগলাম জায়গাগুলো সম্পর্কে। শীতটা তখন আরো জেঁকে বসেছিল। যশোর বিমান বন্দর পর্যন্ত গিয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে ভাইয়া আগালেন গ্রামের সরু গলির দিকে।
একটু বাদেই দেখা গেলাম গ্রামের বাজারের। বেশ জমজমাট বাজার, এখানে ওখানে আড্ডার দল। ভাইয়া এখানকার স্পেশাল চটপটি অর্ডার করলেন, এখানে এটাকে ‘বড়া চটপটি’ বলে। সাথে যোগ হলো মাংসের বড়া আর ছোলা মাখা। এরপর আমরা সেনা নিবাস হয়ে আবার শহরের দিকে আগালাম।
যশোরের ‘ধর্মতলা’ নামটি অনেকে শুনে থাকবেন। এখানকার মালাই চা খেতে ভুলবেন না। আমার মতো চা প্রেমী হলে আরো অসংখ্যবার যেতে চাইবেন শুধু এই চায়ের টানে। বেশ ভিড় আর লম্বা সিরিয়ালের পর চা হাতে আসে। স্বাদ! এখনো সেরা আমার কাছে।
একদিনের ছোট্ট ভ্রমণে (কয়েক ঘণ্টার ভ্রমণ আসলে) যশোরের পৌর পার্ক, ক্যাথলিক চার্চ, যশোর পৌরসভা, টাউন হল, চারুপাঠ আর্ট রিসোর্স ইন্সটিটিউট, যশোর বিমান বন্দর ও সেনা নিবাস, যশোরের স্পেশাল বড়া চটপটি আর ধর্মতলার স্পেশাল মালাই চায়ের স্মৃতি নিয়ে ফিরেছি (সাথে রয়েছে যাওয়ার ও ফেরার পথে যমুনা সেতুর অসাধারণ সৌন্দর্য)।
যশোরে আরো অসংখ্য ভ্রমণের স্থান রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য- সাগরদাঁড়ি, কবি মধুসূদনের বাড়ি, কেশবপুরের হনুমান গ্রাম, বিনোদিয়া পার্ক, যশোর বোট ক্লাব, জেস গার্ডেন পার্ক, ভবদহ বিল, গদখালি কালীবাড়ী, শ্রীধরপুর জমিদার বাড়ি, বেনাপোল স্থল বন্দর, গদখালি ফকির টিকা , শিমুলিয়া মিশন (সাহেব বাড়ি), বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখের সমাধি, চৌগাছা।
হাতে সময় থাকলে কিছু দারুণ ভ্রমণের স্থান তালিকায় যুক্ত করে বেড়িয়ে পড়তে পারেন যশোরের উদ্দেশ্যে।

যেভাবে যাবেন

যশোর যাওয়ার তিনটি উপায় আছে। বাস, ট্রেন ও বিমান এই তিনটি মাধ্যমেই যেতে পারবেন যশোর। সেক্ষেত্রে আপনার যাতায়াত সুবিধা ও খরচের সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রেখে আপনার ভ্রমণের জন্য যানবাহন বাছাই করবেন।

0 Comments:

Post a Comment